বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট

Bongabondhu Satellite
ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তানের নিজস্ব স্যাটেলাইট আছে। শ্রীলঙ্কা ও নিজেদের একটি স্যাটেলাইটের জন্য উদ্যোগ করছে। টেলিভিশন, টেলিফোন ও বেতার সম্প্রচারের জন্য বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয় করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজেদের একটি স্যাটেলাইট থাকলে, প্রতিবেশী দেশগুলোর (নেপাল, ভুটান, মায়ানমার) কাছে অব্যবহৃত অংশ ভাড়া দিয়ে বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি সফলভাবে মহাকাশে গেলে বিশ্বের ৫৭ তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ।

কক্ষপথ
সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ, রাশিয়ার কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিকের ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্বের একটি কক্ষপথ কিনেছে। ভবিষ্যতের জন্য আর তিনটি(৬৯ ডিগ্রি পূর্ব, ১০২ ডিগ্রি পূর্ব, ১৩৫ ডিগ্রি পূর্ব) কক্ষপথ কেনার পরিকল্পনা আছে। এটি ১৫ বছরের এক মেয়াদে ক্রয় করা হবে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। স্লট কিনতে খরচ হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ প্রায় ২১৯ কোটি টাকায় কেনা হয়েছে এ স্লট। এই কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমিনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এই স্যাটেলাইট দিয়ে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না বলে জানা গেছে।

ব্যয়
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা(প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা)। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। আর ঋণ হিসেবে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি দিচ্ছে বাকি ১ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। এটি উৎক্ষিপ্ত হবে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ স্কিমে যাতে রক্ষণাবেক্ষণে সুবিধা হয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন যে উৎক্ষেপণের পর সাত থেকে ৮ বছরের মধ্যে খরচ ওঠানো সম্ভব।

অর্থায়ন
এই ঋণের সুদ হার ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৫১ শতাংশ ও লাইবর (লন্ডন আন্তব্যাংক সুদ হার) সুদ হার। এর মানে হলো, ১ দশমিক ৫১ শতাংশ সুদের সঙ্গে লাইবরের প্রযোজ্য সুদ হার যোগ হবে। বিটিআরসিকে এই ঋণ আগামী ১২ বছরে মোট ২০টি কিস্তিতে শোধ করতে হবে।

আয়
দেশের বেশ কয়েকটি স্যাটেলাইট চ্যানেলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের বাইরে বাংলাদেশি চ্যানেলের সবচেয়ে বড় বাজার হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। এখন দেশের প্রায় সব চ্যানেল হংকংয়ের অ্যাপস্টার-৭ নামের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে। এই স্যাটেলাইট দিয়ে বাংলাদেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সেবা দিতে পারছে চ্যানেলগুলো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দিয়ে সেটি করা সম্ভব হবে না। এই কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমিনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। বিদেশি স্যাটেলাইটের জন্য দেশীয় চ্যানেলগুলোকে যে ভাড়া দিতে হয়, সরকার তার চেয়ে কম ভাড়া নিলে দেশীয় চ্যানেলগুলো নিজস্ব স্যাটেলাইটই ব্যবহার করবে বলে আশা করা যায়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা/বিক্রির জন্য রাখা হবে।

বর্তমানে স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করে। এ জন্য বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা ১১২ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়। নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকলে প্রতিবছর ১১২ কোটি টাকা হিসেবে স্যাটেলাইটের ১৫ বছরের জীবনকালে সাশ্রয় হবে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের প্রায় ৩৭টি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল যারা এখন বিদেশের স্যাটেলাইট নির্ভর ফ্রিকোয়েন্সিতে প্রচারণা চালাচ্ছে, তাদের কাছে ফ্রিকোয়েন্সি বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ১২৫ কোটি ডলার আয় করা যাবে। তবে, এই টিভি চ্যানেলগুলি এখনকার প্রচলিত ক্যাবল ভিত্তিক প্রচারণার পরিবর্তে ছোট ছোট ডিস অ্যানটেনার ডাইরেক্ট টিভি সিগনাল পাবে। সেই সিগনাল ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দের দায়িত্ব থাকবে দুটি প্রতিষ্ঠান। বেক্সিমকো গ্রুপ এবং বায়ার মিডিয়া এই পুরো টিভি চ্যানেল ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ এবং সিগন্যাল বিকিকিনির পুরো ব্যবসায়িক দিকটি উপভোগ করবে। এদের ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি এখানে ডিটিএস প্রযুক্তির ব্যবসায় নামতে পারবে না বলে জানানো হয়েছে। উৎক্ষেপণের পর পরবর্তী ১ বছর পর্যন্ত এর তদারকি করবে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। এটি আগামী ১৮ বছর পর্যন্ত মহাকাশে থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি এবং কাজ করতে পারবে বলে জানানো হয়।

উৎক্ষেপণ
৭ মে,২০১৮ মহাকাশে উড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের লঞ্চ প্যাড থেকে এটিকে মহাকাশের নির্ধারিত কক্ষপথের উদ্দেশে পাঠানো হবে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো তৈরি করেছে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। গত ৩০ মার্চ একটি বিশেষ উড়োজাহাজে করে ফ্রান্স থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল লঞ্চ প্যাডে স্যাটেলাইটটি পৌঁছায়। স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন-৯’ রকেটে করে স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পাঠানো হবে।

সেবা ও সুবিধা
এই কৃত্রিম উপগ্রহটি টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও বেতারসহ ৪০ ধরনের সেবা দেবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ টেরেস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা বহাল থাকা, পরিবেশ যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে ই-সেবা নিশ্চিত করবে।
স্যাটেলাইটের কার্যক্রম পুরোপুরিভাবে শুরু হলে আশপাশের কয়েকটি দেশে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা দেওয়ার জন্য জিয়োসিনক্রোনাস স্যাটেলাইট সিস্টেমের (৪০ ট্রান্সপন্ডার, ২৬ কেইউ ব্র্যান্ড, ১৪ সি ব্যান্ড) গ্রাউন্ড সিস্টেমসহ সব ধরনের সেবা পাওয়া যাবে।

এ ছাড়া দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এ ছাড়া টেলিচিকিৎসা, ই-শিক্ষা, গবেষণা, ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম ) সেবা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যাবে এই স্যাটেলাইট।

পরিচালনা
দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পরিচালনার জন্য ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে নতুন একটি কোম্পানি হচ্ছে। এটির লোকবল নিয়োগ ও তাঁদের প্রশিক্ষণের জন্য থ্যালেসের সঙ্গে ২০২০ সাল পর্যন্ত চুক্তি আছে। কোম্পানির অনুমোদিত মূলধন হবে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং এর ৫০০ কোটি শেয়ার হবে ১০ টাকা মূল্যের। বাংলাদেশের গাজীপুরে প্রায় ১৩ একর জায়গার ৫ একর জুড়ে এই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে বিদেশি স্যাটেলাইট ইঞ্জিনিয়ার কাজ করছে। বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, নিজস্ব লোকবল দিয়েই যাতে ভবিষ্যতে স্যাটেলাইটটি চালানো যায়, সেই লক্ষ্য নিয়েই কোম্পানি গঠনের সব কাজ চলছে।

স্যাটেলাইটটির জন্য দুটি ভূ-স্টেশন থাকবে চট্টগ্রামের বেতবুনিয়ায় ও গাজীপুরের BTCL স্টাফ কলেজে। আর BTRC ভবনে একটি রক্ষণাবেক্ষণ কার্যালায় থাকবে। স্যাটেলাইট ওড়ানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এ জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন (ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা) তৈরি করা হয়েছে।

ট্রান্সপন্ডার
এটি তারবিহীন কমিউনিকেশন যন্ত্র যা স্যাটেলাইটের সাথে যুক্ত থাকে। Transponder শব্দটি এসেছে দুটি শব্দ থেকে Transmitter ও Responder. এটি একধরনের মাইক্রোওয়েভ অ্যানটেনা, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রেঞ্জের ফ্রিকুয়েন্সির ভয়েস, ডেটা ও ভিডিও সহ বিভিন্ন সিগন্যাল গ্রহণ করে। একই সাথে তা অন্য ফ্রিকুয়েন্সিতে Transmit ও করতে পারে। তাই এর নাম হয়েছে ট্রান্সপন্ডার।

ডিরেক্ট টু হোম
Direct To Home(DTH): এমন একটা সেবা যার মাধ্যমে ডিসের তার বা ক্যাবল ছাড়া সম্প্রচার করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে তারের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া হয় না। বরং বাড়িতে টিভির সাথে একটি গ্রাহক যন্ত্র থাকে যা প্রেরির টিভি সিগন্যাল গ্রহণ করতে পারে।

লঞ্চ প্যাড (Launch Pad)
যে স্থান হতে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হয়।

Add a Comment