Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

গ্রীষ্মকালে বর্ষা, শীতকালে কী হবে?

প্রথম আলো, ০৯ জুন ২০১৮
আব্দুল কাইয়ুম প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক


এবার বৈশাখের আগেই কালবৈশাখী শুরু হয়েছে। গ্রীষ্মকালে এমন বর্ষা শুরু হলো যে মনে হয়, এবার আর বর্ষায় বর্ষা নামবে না। আবার কেউ বলেন এবার বর্ষায় বন্যা হতে পারে। আর যদি শীতকালে গরম শুরু হয়, হয়তো বিলাত-আমেরিকা থেকে বড় বড় পরিবেশবিজ্ঞানী এখানে এসে গবেষণা শুরু করবেন। এর কারণ কী?

বলা হয়, এটাই হলো আবহাওয়া বিপর্যয়। সব উল্টাপাল্টা। একে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বিশেষ লক্ষণ বলে পরিবেশবিজ্ঞানীরা মনে করেন।

আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের একটা দিকই জানি। এককথায় বলি পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বাড়ছে। হিমালয় পর্বতমালার চূড়ায় বরফ গলছে। মেরু অঞ্চলের হাজার হাজার বছরের জমাটবাঁধা বরফ গলে গলে ভেঙে পড়ছে। মোটকথা তাপমাত্রা বাড়ছে।

কিন্তু এর আরেকটা দিক আছে। চরম আবহাওয়া। যখন-তখন মহাসাগরে নিম্নচাপ। আবার আমেরিকায় অসময়ে বরফ পড়তেও দেখা গেছে। এই কাণ্ড দেখে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার সিনেটর জিম ইনহফ তাঁর বাসার উঠান থেকে এক মুঠো তুষার এনে দলা পাকিয়ে সিনেট কক্ষে অধিবেশনের সভাপতির দিকে ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘ধরুন, দেখুন এটা কী। বাইরে চারদিকে তুষারপাত, জানেন তো?’

সেটা ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। তখন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক এলাকায় ভীষণ তুষারপাত হয়েছে। অবশ্য তারপরও দেখা গেছে, গড় তাপমাত্রা আগের চেয়ে একটু বেশিই ছিল।

কিন্তু আবহাওয়া বিপর্যয়কে সামনে টেনে এনে কেউ কেউ বলছেন, সব ভুয়া। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলে কিছু নেই। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর(2017) বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেয়। এরপর সারা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়।

বিজ্ঞানীরা এর তীব্র সমালোচনা করেন। আসলে তো সবাই বুঝতে পারছি, গরমকালে কোথাও হঠাৎ যদি বরফ পড়তে শুরু করে, তাহলে সেটা হবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আসন্ন বিপর্যয়েরই একটি আভাস।

তাহলে কী করতে হবে? একটাই উপায়, তেল-কয়লা, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ, বন ধ্বংস বন্ধ করতে হবে। সবুজ গাছপালা, বন বাড়াতে হবে। কিন্তু বনের জন্য অনেক জমি দরকার। যেভাবে জনসংখ্যা বাড়ছে, কতটা বনই–বা থাকবে।

সুতরাং বায়ুমণ্ডলের কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি বাতাস থেকে কার্বন শুষে নেওয়ার বিকল্প পদ্ধতিও দরকার। এ বিষয়ে গবেষণা চলছে। কিছু আবিষ্কারও হয়েছে। কিন্তু এতে খরচ অনেক। সেটা খুব বেশি চলবে না।

ওমানের পার্বত্য অঞ্চলে একধরনের শিলা পাওয়া গেছে, যা হাজার হাজার বছর ধরে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে ঘন কালো পাথরে পরিণত হয়েছে। একে বলা হচ্ছে প্রাকৃতিক উপায়ে কার্বন-খনিজ তৈরির প্রক্রিয়া। সাগরের তলদেশের শক্ত স্তরে পেরিডটাইট শিলা বাতাসের কার্বন শুষে নিতে পারে। এই স্তরটি ওমানের কিছু এলাকায় ওপরে উঠে আসায় সেখানে কার্বন শোষণ প্রক্রিয়া চলেছে। ওমানের পাথুরে খনিজ বছরে প্রায় ১০০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছে (২৬ এপ্রিল ২০১৮)।

তবে এতে খুব বেশি কাজ হবে বলে মনে হয় না। কারণ, এখন বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হচ্ছে। তাই কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপায়ে কার্বন শোধনের আরও উপায় কোথায় কতটা আছে, খুঁজে বের করা দরকার। প্যারিস চুক্তিতে বলা হয়েছে, শিল্পবিপ্লবের যুগের আগের তুলনায় ২০৫০ সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হবে। চেষ্টা করতে হবে, যেন দেড় ডিগ্রির বেশি না বাড়ে। এ জন্য আইনের কড়াকড়ি করে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমাতে হবে। সেটা যদি আমরা না করতে পারি, তাহলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে এমন এক অবস্থা আসবে, যখন হয়তো পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

সমস্যা হলো, আমরা যদি বর্তমান সভ্যতার মাত্রা ধরে রেখে আরও এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে আরও অনেক বেশি জ্বালানি শক্তি দরকার। তেল না পোড়ালে বিকল্প হিসেবে সৌরশক্তি, পানিবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তি ব্যবহার সহজলভ্য করতে হবে। ঝুঁকি থাকলেও সতর্কভাবে পরমাণুশক্তির ব্যবহার বাড়ছে। সেখানেও আরেক ধরনের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। এখন বেছে নিতে হবে, আমরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে মরব, নাকি পরমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপর্যয়ে। আসলে আমাদের সামনে বিকল্প খুব কম।

এখন চিন্তা করা যায়, যেহেতু বনায়নের যথেষ্ট জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না, বন রক্ষাও কঠিন, তাহলে ল্যাবরেটরিতে বনায়নের ব্যবস্থা করতে পারি কি না? মনে হয় হাস্যকর প্রস্তাব। ল্যাবরেটরিতে আবার বন হবে কীভাবে? না, সেটা একটু ভিন্ন ধরনের। গাছের সবুজ পাতার ক্লোরোফিল সূর্যের আলো থেকে শক্তি, মাটি থেকে পানি এবং বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে ফটোসিনথিসিসের মাধ্যমে তার খাদ্য, মানে নিজের কাণ্ডের কাঠ বানায় এবং বাতাসে অক্সিজেন বিমুক্ত করে। এভাবে সে কার্বনের বিপদ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে।

এখন যদি আমরা ক্লোরোফিলের স্টেম সেল ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণ করে তার সাহায্যে ফটোসিনথিসিস প্রক্রিয়া চালাই, তাহলে কি আমরা ল্যাবরেটরিতেই বাতাসের কার্বন পরিশোধনের কাজটি করতে পারি না? এতে বিশাল বনের দরকার হবে না, আবার বনের গাছের আসল কাজ, কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে বাতাসে অক্সিজেন বিমুক্ত করার কাজটিও করতে পারি।

এ রকম একটি প্রস্তাব আমি ২০০৯ সালে কোপেন হেগেনে অনুষ্ঠিত কপ (কনফারেন্সেস অব পার্টিজ)-১৫ জলবায়ু সম্মেলনে একটি আলোচনায় বলি। একজন জার্মান বিশেষজ্ঞ বলেন, এটা সম্ভব নয়, কারণ এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হবে কোটি কোটি ঘনফুট কাঠ। এত কাঠ রাখব কোথায়? উত্তরে আমি বলি ওই কাঠ দিয়ে আমরা ঘরের দরজা-জানালা, আসবাবপত্র বানাব। কাঠও পাব, কার্বনও ধ্বংস হবে আবার কাঠ বিক্রি থেকে আয়ও হবে। শেষে তিনি বলেন, এটা নিয়ে ভাবা যায়।

আসলে এ ধরনের কিছু একটা সহজ উপায় আমাদের বের করতে হবে। তবে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবেই। না হলে আগামী কয়েক শ বছরে পৃথিবীতে মানবসভ্যতা বিলুপ্ত হতে পারে।

The End

Add a Comment