Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

নির্বাচন ও জনতুষ্টিবাদী কৌশল

প্রথম আলো, ১৪ জুন ২০১৮
এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক


বিশ্বের এই সময়ের রাজনীতি ও এর ধারা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘পপুলিজম’–এর নীতি বা কৌশলকে এখন বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই,
বাংলায় যা লোকরঞ্জনবাদ বা জনতুষ্টিবাদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। রাজনীতির ইতিহাসে এই ‘ইজম’ বা ‘বাদ’ অবশ্য খুব নতুন নয়। তবে নতুন করে ফিরে এসে এই ধারণা এরই মধ্যে বেশ বাজিমাত করে ফেলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক রাজনৈতিক দল এখন এই কৌশলের ওপর ভর করেছে। এতে সফলতাও মিলেছে।
যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিটপন্থীরা গণভোটের সময় এই জনতুষ্টিবাদের কৌশল নিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের কৌশলও ছিল তা–ই। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মেরি লো পেন শেষ পর্যন্ত জিততে না পারলেও দেশটির উদারনৈতিক মানুষদের মধ্যে তিনি ভয় ধরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। নির্বাচনে ৭৬ লাখ ভোট পেয়েছিলেন তিনি। এর সরল অর্থ হচ্ছে, এত বিপুলসংখ্যক ফরাসি মেরি লো পেনের চরম ডানপন্থী ও রক্ষণশীল নীতির সমর্থক এবং তাঁকে দেশ পরিচালনার জন্য উপযুক্ত মনে করেন। এমন কৌশলকে এখন পরীক্ষিত ও ফলদায়ক হিসেবে বিবেচনা না করে উপায় কী!

আগেই বলেছি, জনতুষ্টিবাদের রাজনীতি বা কৌশল কোনো নতুন বিষয় নয়। কিন্তু পশ্চিমে যখন এই কৌশল ফল দিতে শুরু করেছে, তখন এ নিয়ে নতুন করে তাত্ত্বিক আলোচনা-বিশ্লেষণ এসব শুরু হয়েছে। বিশ্বের দিকে নজর দিলে এখন দেখা যাবে, এই কৌশল কাজে লাগিয়ে বেশ কিছু নেতা ‘সফলভাবে’ দেশ চালাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প, রাশিয়ার পুতিন, তুরস্কের এরদোয়ান, ফিলিপাইনের দুতার্তে, ভারতের মোদি, মিসরের সিসি বা হাঙ্গেরির ওরবান—এমন অনেক নামই আমাদের জানা। প্রবল দাপট আর প্রতাপের সঙ্গে তাঁরা দেশ শাসন করে যাচ্ছেন। তাঁদের জনপ্রিয়তা নেই, এমন বলা যাবে না। তাঁরা সবাই সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। বর্তমান যুগের এই জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির কৌশলগুলো কী? কোনো সাধারণ সূত্র মেনে কি তা পরিচালিত হয় বা এসব নেতা কী কী কৌশল নেন—এসব নিয়ে এখন বিস্তর লেখালেখি ও গবেষণা ও তাত্ত্বিক আলোচনা হচ্ছে।
পাঠকের সুবিধার জন্য বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ থেকে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি বা এর কৌশলের কিছু সাধারণ দিক তুলে ধরছি। সাধারণভাবে জনতুষ্টিবাদের মূল দুটি অস্ত্র হচ্ছে, জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম। এর ওপর ভর করে নেতারা জনগণের দেশাত্মবোধ, জাতিগত বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা, তাদের বিভিন্ন আবেগ, বঞ্চনার অনুভূতি বা হতাশাকে চিহ্নিত করেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করেন।
নির্বাচনী রাজনীতির হিসাব-নিকাশে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আমজনতাই তাঁদের বিবেচ্য। জনতুষ্টিবাদী নেতারা জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ বা হতাশা দূর করার স্বপ্ন দেখান। এসব স্বপ্ন আদৌ বাস্তবায়ন করা যাবে কি না, তা বিবেচনায় না নিয়েই তাঁরা প্রতিশ্রুতি দেন। এই রাজনীতিতে কোনো একটি পক্ষকে শত্রু হিসেবে দাঁড় করাতে হয়। সেটা করতে গিয়ে জনতুষ্টিবাদ ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর কৌশল নেয়। এই ধারার নেতাদের একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, তাঁরা যা বলেন বা প্রতিশ্রুতি দেন, তার পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ হাজির করার ধার ধারেন না। বিদেশি কোনো শক্তি বা তাদের দেশীয় দালালদের দেশের সব অঘটন বা সমস্যার জন্য দায়ী করার কৌশল নেওয়া হয়।

বলা হয়, নির্বাচনী গণতন্ত্র ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের একটি জগাখিচুড়ি হচ্ছে আধুনিক সময়ের জনতুষ্টিবাদী শাসনব্যবস্থা। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সাধারণত জটিল কোনো সমস্যার খুব সহজ সমাধানের পথ ধরা হয়। এর মাধ্যমে জনগণকে তুষ্ট করার চেষ্টা হয়। সমস্যার গভীরে যাওয়া বা এর ফলাফল শেষ পর্যন্ত
কী হতে পারে, সেগুলো আদৌ বিবেচনায় নেওয়া হয় না। অনেকের মতে, এটা এমন একধরনের রাজনৈতিক চর্চা, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাংবিধানিক বা নিয়মতান্ত্রিক পথে না গিয়ে ভিন্নভাবে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের এই অসাংবিধানিক বা অনিয়মতান্ত্রিক কাজগুলো নিয়ে যাতে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে, সে ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক থাকেন। ফলে জনতুষ্টিবাদী শাসনব্যবস্থা আদালত বা বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, পেশাজীবীদের সংগঠন বা এনজিওগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালায়।

জনতুষ্টিবাদী নীতির ওপর ভর করে এখন বিশ্বের কোন কোন দেশ চলছে?—এমন প্রশ্নের উত্তরে এখন যে দেশগুলোর নাম উঠে আসে, সেখানে বাংলাদেশ নেই। কিন্তু জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির যে কৌশলগুলো আগে উল্লেখ করলাম, সেগুলোর ব্যবহার বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিন্তু বেশ পুরোনো। বলা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশে ’৭৫–পরবর্তী রাজনীতিতে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের হাত ধরে তা শুরু হয়। দেশে আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ধর্ম ও জাতীয়তাবাদকে মূল অস্ত্র হিসেবে বেছে নেন। তুলে ধরেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা। ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজের সহায়ক শক্তি হিসেবে দাঁড় করান। সংবিধানে যোগ করেন ‘বিসমিল্লাহ’। ভারত বিরোধিতার রাজনীতি পৃষ্ঠপোষকতা পায় সেই সময়ে। জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির সূচনা করেন, তার বাইরের সবাইকে তখন ‘রুশ-ভারতের দালাল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়। সবুজ বিপ্লব, খাল কাটা বা খেতের আল তুলে দেওয়ার মতো চটকদারি কথাবার্তা বলে তিনি জনগণকে অসম্ভব ও অবাস্তব উন্নয়নের স্বপ্ন দেখান।

সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদও সেই একই পথে হেঁটেছেন। ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করেছেন, প্রতি শুক্রবার মসজিদে মসজিদে ঘুরে অসত্য কথা বলেছেন। সাইকেলে চড়ে অফিসে গিয়ে খরচ কমানোর চমক দেখাতে চেয়েছেন। বন্যায় কোমরপানিতে হেঁটে জনগণের জন্য তাঁর কতটা মায়া, তা দেখাতে চেয়েছেন। এসব তাঁকে করতে হয়েছে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ যাবতীয় অপকর্ম ঢাকতে এবং নিজের অবৈধ শাসনকে টিকিয়ে রাখতে।

নব্বইয়ের পর আমাদের দেশে গণতন্ত্র নতুন করে ফিরেছে কিন্তু দেশের রাজনীতি জনতুষ্টিবাদের পথেই হেঁটেছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে আমরা বিএনপির মুখে শুনেছি আওয়ামী লীগ জিতলে দেশে মসজিদে নামাজ পড়া যাবে না, সেখানে উলুধ্বনি হবে। দেশ ভারতের দখলে চলে যাবে, অন্তত পার্বত্য চট্টগ্রাম তো আর বাংলাদেশের অংশই থাকবে না। এই রাজনীতি মোকাবিলার কৌশল আওয়ামী লীগ নিয়েছে সেই একই জনতুষ্টিবাদী কায়দায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে নিজেদের ইসলামপ্রেমী প্রমাণে আওয়ামী লীগের মরিয়া চেষ্টা আমরা দেখেছি। হিজাব মাথায় বা মোনাজাত করা অবস্থায় শেখ হাসিনার ছবি দিয়ে পোস্টার ছাপতে দেখেছি দলটিকে। আওয়ামী লীগ-খেলাফত মজলিশ নির্বাচনী সমঝোতা থেকে শুরু করে বর্তমানে হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠতা—সবই জনতুষ্টিবাদী কৌশল। এ কারণেই আওয়ামী লীগকে পাঠ্যপুস্তক বদলে ফেলতে হয়, নারীনীতি থেকে সরে আসতে হয় বা বাল্যবিবাহ আইনে ‘বিশেষ বিধান’ রাখতে হয়।

জনতুষ্টিবাদী রাজনৈতিক কৌশলের যে ধারাবাহিকতা বাংলাদেশে চলে আসছিল, তা বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় উপযুক্ত আলো-বাতাস পেয়ে আরও পরিপুষ্ট হওয়ারই কথা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখনকার কৌশল হবে আরও পরিকল্পিত, সংগঠিত ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে। সামনে নির্বাচন আসছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জনতুষ্টিবাদী কৌশল নেওয়ার এটাই সবচেয়ে দরকারি সময়। সরকারের বর্তমান মাদকবিরোধী অভিযানকে সরকারি দল আওয়ামী লীগের এমনই এক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
দেশের মাদক পরিস্থিতি যে ভয়াবহ, তাতে সন্দেহ নেই। নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও নানা সূত্রে দেশে এক কোটির বেশি মাদকসেবী রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দেশের কতগুলো পরিবার সরাসরি এই সমস্যার ভুক্তভোগী, তা অনুমান করা যায়। মাদকবিরোধী যেকোনো অভিযানই (তা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা অন্য যেকোনো উপায়ে সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ীদের নির্মূল করার পথই হোক) যে জনগণের সমর্থন পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকারও এটা ভালো করেই জানে। এটা কার্যকর ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরীক্ষিত একটি কৌশলও। এই কৌশল কাজে লাগিয়ে ‘সফলতা’ পেয়েছেন ফিলিপাইনের দুতার্তে। ছিলেন একটি অঞ্চলের মেয়র, ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণার ফল হিসেবে জনগণ তাঁকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে।

কক্সবাজারের একরামুল নিহত হওয়ার ঘটনাটি হয়তো মাদকবিরোধী অভিযানকে কিছুটা হোঁচট খাইয়ে দিয়েছে। কিন্তু এমন অভিযানের পেছনে যে আমজনতার সমর্থন রয়েছে, তা টের পাওয়া যায়। সরকার ভেবেচিন্তেই নির্বাচনের আগে এই কৌশল নিয়েছে। ফলে এই অভিযান নিয়ে দেশের নাগরিক সমাজ, সচেতন জনগণ বা মানবাধিকারকর্মীরা কী বললেন, তা সরকার বা সরকারি দলের কাছে আদৌ পাত্তা পাচ্ছে না।

মাদকবিরোধী এই অভিযান ছাড়াও সামনে এ ধরনের জনতুষ্টিবাদী আরও কিছু অভিযানের আভাস সরকারি দলের নেতাদের মুখে মিলেছে। সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা শোনা গেছে। যদি সত্যিই সামনে এমন অভিযান শুরু হয়, তবে সেগুলো যে নির্বাচনকে মাথায় রেখেই হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সাধারণ জনগণ এতে খুশি হতে পারে, ভোটের বাজারে তা কাজেও লাগতে পারে। কিন্তু এভাবে মাদক, সন্ত্রাস বা দুর্নীতি দূর করা যায় না। এবং এমন অভিযান চালিয়ে এসব দূর করা গেছে, এমন কোনো উদাহরণও নেই। সমস্যা হচ্ছে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির কৌশলে এসব বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এ ধরনের অভিযান একটি দেশের কী ক্ষতি করতে পারে, তার কিছু দৃষ্টান্ত বরং রয়েছে। আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, যে দেশেই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বিচারবহির্ভূতভাবে মানুষ মারা হয়েছে, সেই সব দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন অপরাধ করছে অনেক বেশি। সরকার এসব পরামর্শ বা সতর্কতার কিছুই বিবেচনায় নেবে বলে মনে হচ্ছে না। জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি তো এমনই।

Add a Comment