Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

সরকার বলছে মানবাধিকার অগ্রগতি ‘চমৎকার’

প্রথম আলো, ১৪ মে ২০১৮
বিশেষ প্রতিনিধি, জেনেভা


  • জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে আজ পর্যালোচনা বৈঠক শুরু
  • সরকার বলছে, মানবাধিকারের ক্ষেত্রে চমৎকার অগ্রগতি
  • জাতিসংঘে বেসরকারি প্রতিবেদনে বিপরীত চিত্র
  • আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে কয়েকটি দেশের প্রশ্ন

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশ মানবাধিকারের ক্ষেত্রে চমৎকার অগ্রগতি লাভ করেছে বলে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পেশ করা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের আগাম উত্থাপিত প্রশ্নমালায় গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধীদলীয় সদস্যদের গ্রেপ্তার, মতপ্রকাশের অধিকার সংকোচন, ৫৭ ধারা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা এবং বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের যেসব পরিসংখ্যান ও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা একেবারেই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সর্বজনীন নিয়মিত পর্যালোচনা বা ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ, যা ইউপিআর নামে পরিচিত তার তৃতীয় সভায় উপস্থাপনের জন্য পেশ করা প্রতিবেদন ও নথিতে এই পরস্পরবিরোধী চিত্র উঠে এসেছে। আজ সোমবার জেনেভায় এই পর্যালোচনা শুরু হচ্ছে। আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে কি না যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ সেই প্রশ্নও তুলেছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম এবং ২০১৩ সালের এপ্রিলে দ্বিতীয় ইউপিআর অনুষ্ঠিত হয়। মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার এই পদ্ধতি শুরু হয় ২০০৪ সালে এবং জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্রই এই পর্যালোচনার অধীন। একই দিনে রাশিয়ারও ইউপিআর পর্যালোচনার কথা রয়েছে। পর্যালোচনার ভিত্তিতে একটি সুপারিশমালা তৈরি করা হবে এবং তা আগামী বৃহস্পতিবার ১৭ মে প্রকাশ করা হবে। এই পর্যালোচনা সভায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাধিক প্রতিনিধিরও সভায় অংশ নেওয়ার কথা আছে।

২০১৩ সালের ইউপিআরে বাংলাদেশের জন্য ১৯১টি সুপারিশ গৃহীত হয়েছিল। একই বিষয়ে অনেকগুলো সুপারিশেরও নজির রয়েছে। সরকারের পেশ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দ্বিতীয় ইউপিআরের যেসব সুপারিশ বাংলাদেশ গ্রহণ করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে এবং সরকার সেগুলোর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। যেসব ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে সেগুলো বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক শরিকদের সহযোগিতায় আরও জোরালো উদ্যোগ নেওয়ার কথাও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষা আইন, খাদ্য নিরাপত্তা আইন, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন, শিশু আইন, বাল্যবিবাহ নিরোধক আইনসহ ২০১৩ থেকে ২০১৭ সময়ে প্রণীত অধিকারবিষয়ক আইন এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যনীতি, সম্প্রচারনীতি, পুষ্টিনীতি, ওষুধনীতি, অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালাসহ বিভিন্ন বিষয়ে গৃহীত নীতিগুলোর কথা সরকারি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ধর্মপালনের অধিকার-বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ারের এবং শরণার্থীবিষয়ক র‍্যাপোর্টিয়ার বাংলাদেশে সফরের কথা উল্লেখ করে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পেশ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বিগত ইউপিআরের সুপারিশমালা গ্রহণ করা সত্ত্বেও বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং যথেচ্ছ গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। একটি প্রতিবেদনে ২০১৩ সালের মে থেকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৮৪৫টি বিচারবহির্ভূত হত্যা, ৩০০ জন গুম এবং ৪৮ জনের নির্যাতনে মৃত্যুর রেকর্ডের কথা বলা হয়েছে। ২০১৩ সালে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন তৈরির পরও পদ্ধতিগতভাবে নির্যাতনের প্রচলন ব্যাপক বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই সময়ে ৪৫ জন গুম হওয়ার কথা জানিয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গত নির্বাচন এবং ২০১৫ সালে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বেআইনি গ্রেপ্তার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মাত্রাতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগের ঘটনাগুলো তদন্তের কথা বলেছে। একই সঙ্গে কমিশন নির্যাতন নিরোধক আইন কার্যকরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এবং ইন্টারন্যাশনাল জুরিস্টস কাউন্সিল এসব গুমে আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর জড়িত থাকার কথা বলেছে। এইচআরডব্লিউ র‍্যাব ভেঙে দেওয়া এবং অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কারের কথা বলেছে। গুমের অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছে এসব সংগঠন। গুম, নির্যাতন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক র‍্যাপোর্টিয়ারদের সরেজমিন পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশে আসার সুযোগ এখনো দেওয়া হয়নি বলেও বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে জানানো হয়।

ধর্মীয়, জাতিগত এবং ভাষাগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরকার সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে কয়েকটি সংগঠন অভিযোগ করেছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বিদেশি কোম্পানি এ ধরনের অধিকার লঙ্ঘনে জড়িত জানিয়ে বলা হয়েছে, আইনশৃংখলা বাহিনী এ রকম ঘটনার ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ রাখছে।

বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোর কাজের সুযোগ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে আগের ইউপিআরের ২৩টি সুপারিশ ছিল। কিন্তু সরকার সেগুলোর একটিও বাস্তবায়ন করেনি বলে অভিযোগ এসেছে। মানবাধিকাররক্ষী বা সংগঠকদের সুরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার প্রতিপালন করা হচ্ছে না বলেও তাঁরা দাবি করেছেন। অ্যামনেস্টি, এইচআরডাব্লু, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং রিপোর্টার্স স্য ফ্রঁতিয়ে অভিযোগ করেছে যে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা পেশাদার সাংবাদিক, ব্লগার ও লেখকেরা শারীরিক লাঞ্ছনা ও আইনগত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগের উল্লেখ করে তারা প্রস্তাবিত নতুন ডিজিটাল আইনে একই রকম নিবর্তনমূলক বিধান না রাখার ওপর জোর দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চেয়েছে। অবাধে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপগুলোর কথাও যুক্তরাষ্ট্র জানতে চেয়েছে। প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটাও তাদের জিজ্ঞাসা। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্তে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্নও করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাজ্য জানতে চেয়েছে গুম বিষয়ে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের কমিটির জিজ্ঞাসার কী জবাব দেওয়া হয়েছে। উভয় দেশই ধর্মীয়সহ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কথা জানতে চেয়েছে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমকামীদের অধিকারের প্রশ্নও এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ঢাকায় নিহত ইউএসএইড কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয়েও প্রশ্ন রেখেছে।

সুইডেন, জার্মানি, পর্তুগাল, ব্রাজিল, বেলজিয়ামসহ আরও কয়েকটি দেশ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী অধিকার এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ-বিষয়ক আইন সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে বিভিন্ন তথ্য জানতে চেয়েছে।

Add a Comment