Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

নতুন বছর ও নতুন লোকরঞ্জনবাদ

প্রথম আলো
প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সৌজন্যে
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মশিউল আলম
মারগারেট ম্যাকমিলান: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সেন্ট অ্যান্টনি’জ কলেজের ওয়ার্ডেন।


২০১৬ সালে ‘লোকরঞ্জনবাদ’ (পপুলিজম) শব্দটা সবখানে উচ্চারিত হয়েছে। যেসব রাজনৈতিক নেতা দাবি করেন যে তাঁরা যা কিছু বলেন সবই জনগণের স্বার্থে বলেন, তাঁরা ইউরোপ ও এশিয়ায় তাৎপর্যপূর্ণ বিজয় অর্জন করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমেরিকায়ও তাঁদের জয় হয়েছে।

উনিশ শতকের শেষ দিকে আমেরিকান ব্যাংক ও রেলপথগুলোর ওপর একচেটিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে সে দেশের কৃষকদের প্রতিবাদ আন্দোলন বোঝাতে ‘পপুলিজম’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। এখন এই শব্দ দিয়ে বোঝানো হয় সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সুবিধাভোগী ও ক্ষমতাধর অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও ক্ষোভ।

উনিশ শতকের লোকরঞ্জনবাদের লক্ষ্যগুলোর তুলনায় এই নতুন লোকরঞ্জনবাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যগুলো ছড়ানো-ছিটানো, অনির্দিষ্ট। এই লোকরঞ্জনবাদীদের প্রতিশ্রুতিগুলো উচ্চারিত হয় পাইকারি হারে। আজকের লোকরঞ্জনবাদী নেতারা ঘৃণা ছড়াতে ভীষণ উদার; কিন্তু সুনির্দিষ্ট নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁরা টাকাপয়সা বা সম্পদ ব্যয় করতে অনিচ্ছুক। তাঁরা প্রায়ই একই সঙ্গে ডান ও বাম উভয় রাজনীতির ফল ঘরে তুলতে চান। দৃষ্টান্তস্বরূপ ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করবেন এবং ন্যূনতম বেতন বাড়াবেন। আবার একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি ধনীদের কর কমাবেন, আর্থিক খাত ও পরিবেশের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মকানুনগুলো তুলে দেবেন।

লোকরঞ্জনবাদে রাজনৈতিক বিদ্যা–বুদ্ধির কোনো গুরুত্ব নেই; লোকরঞ্জনবাদী নেতারা তথ্যপ্রমাণ হাজির করার ধার ধারেন না; তাঁরা যেসব পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখান, সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন—সে সম্পর্কে বিশদ প্রস্তাবও পেশ করেন না। লোকরঞ্জনবাদে তাই ক্যারিশমাটিক নেতাদের জনগণের আবেগ উসকে দেওয়ার মধ্যেই যত গুরুত্ব।

প্রথাগত রক্ষণশীল বা সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো যেমন আর্থসামাজিক শ্রেণির কথা বলে, নতুন লোকরঞ্জনবাদ তেমনটি না করে পরিচয় ও সংস্কৃতির কথা বলে। বিশ্বায়নের কারণে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি অনুভব করে এমন যেকোনো ব্যক্তিই লোকরঞ্জনবাদের লক্ষ্যবস্তু। যারা এই উদ্বেগে ভোগে যে ভিনদেশি লোকেরা এসে তাদের চাকরিবাকরি নিয়ে নিচ্ছে, সামাজিক গঠন বদলে দিচ্ছে, অথবা যারা স্রেফ এটা মনে করে মনের সুখ–শান্তি হারাচ্ছে যে তারা তাদের মর্যাদা ও অবস্থান হারাচ্ছে—তারা সবাই নতুন লোকরঞ্জনবাদের লক্ষ্যবস্তু।

অর্থনীতিবিদেরা যুক্তি দিতে পারেন যে জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে, কিংবা বলতে পারেন যে উন্নত অনেক দেশে সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে না। কিন্তু যেসব মানুষের মনে হয় যে তাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের একেবারে প্রান্তসীমায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না এবং ভর্ৎসনা করা তাদের অসন্তোষ মোকাবিলা করার সাধ্য অর্থনীতিবিদদের নেই।

নারীদের ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা (সাফ্রাগেট) ও আদি সমাজতন্ত্রীদের মতো প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো প্রায়শই এমন ভাবনা ও নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল, যেসব ভাবনা ও নেতা পরবর্তী সময়ে মূলধারার রাজনীতির একটা অংশ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু নতুন লোকরঞ্জনবাদ ভিন্ন প্রকৃতির, কারণ তা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতা সোজাসাপ্টা অস্বীকার করে এবং খেলার নিয়মকানুন (রুলস অব দ্য গেম) মেনে চলতে অস্বীকৃতি জানায়। যুক্তরাজ্যের ইনডিপেনডেন্ট পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজ একজন নিখাদ লোকরঞ্জনবাদী। কিন্তু আমেরিকান সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, যিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচনে অংশ নিতে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার জন্য হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট পদের জন্য হিলারি ক্লিনটের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন, তিনি লোকরঞ্জনবাদী নন।

নতুন লোকরঞ্জনবাদের নৈতিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ন্যায়নিষ্ঠ ‘জনগণ’ বদমাশ ‘এলিট’ শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কিন্তু কে যে কোন শিবিরের অন্তর্ভুক্ত তা পরিষ্কার নয়। কারণ, লোকরঞ্জনের ভাষা বড় বেশি আবেগসঞ্চারি এবং অনির্দিষ্ট। জনগণ হলো ‘নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা’: ট্রাম্পের ভাষায় ‘সজ্জন, সরল আমেরিকান’ অথবা নাইজেল ফারাজ ও ফ্রান্সের কট্টর দক্ষিণপন্থী ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেতা মারিঁ লে পেঁ’র ভাষায় ‘ছোট মানুষেরা’। আমার নিজের শহর টরন্টোতে তারা হলো ‘ফোর্ডের জাত’, শহরতলির অমায়িক বাসিন্দারা, তাদের মেয়র প্রয়াত রব ফোর্ড একজন জাত্যভিমানী ও কোকেনখোর উত্ত্যক্তকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা কিছু মনে করত না।

লোকরঞ্জনবাদীরা ‘জনগণ’ সংজ্ঞায়িত করার দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে কিছু মানুষকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে। সাধারণ মানুষের অভাব-অনটন ও চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে যে ‘এলিট’ শ্রেণির কোনো ধারণা নেই, তারা স্বাভাবিকভাবেই লোকরঞ্জনবাদীদের কথায় মন্ত্রমুগ্ধ মহলগুলোর বাইরে থেকে যায়। কিন্তু একইভাবে, জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায় যাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তারাও বাইরে থেকে যায়, যেমন আমেরিকান ভোটারদের প্রায় অর্ধেক, যারা হিলারি ক্লিনটনকে বেছে নিয়েছে এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের ৪৮ শতাংশ, যারা যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছে।

বাম লোকরঞ্জনবাদী ও ডান লোকরঞ্জনবাদীদের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো তাদের পছন্দ বা বাছাইয়ের মধ্যে; অর্থাৎ কোন ‘অপরকে’ তারা বাদ দেবে এবং আক্রমণ করবে। বামেরা লক্ষ্যবস্তু করবে বড় বড় করপোরেশন ও ধনকুবেরদের, আর ডানেরা লক্ষ্যবস্তু করবে জাতিগোষ্ঠীগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে। একবার শত্রুরা চিহ্নিত হয়ে গেলে যখনই ‘জনগণের’ মধ্যে হতাশা দেখা দেবে, তখন ওই শত্রুদের দোষ দেওয়া যাবে। আমেরিকায় ট্রাম্প যেমন মেক্সিকান ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেছেন, ঠিক তেমনি ভেনেজুয়েলায় হুগো চাভেজের হতভাগা ও অকর্মা উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো তাঁর দেশের সংকট ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হওয়ার জন্য দোষ দেন বিদেশি শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে।

লোকরঞ্জনবাদীদের আবেদনের প্রধান উপাদান হলো তীব্র জাতীয়তাবাদ এবং সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার নিয়ে কথাবার্তা। আরেকটি উপাদান হলো ইতিহাস বা আরও সঠিকভাবে বললে, অতীতের যেসব বিষয় সুন্দর ও ভালো মনে হয়, সেগুলোর জন্য নস্টালজিয়া। ট্রাম্প এটা ব্যক্ত করেছেন ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে। ইউরোপে লোকরঞ্জনবাদী নেতারা, যেমন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর ওরবান ও নেদারল্যান্ডের পার্টি ফর ফ্রিডম দলের নেতা গির্ট ভিল্ডার্স এমন এক খ্রিষ্টীয় ইউরোপের ছবি আঁকেন যে ইউরোপ দলে দলে মুসলমানেরা এসে দখল করে নিয়েছে। ব্রেক্সিটের পক্ষে প্রচারণার সময় ‘বেরিয়ে যাওয়ার’ পক্ষের শিবির ১৯৪০ সালের ডানকার্ক যুদ্ধের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছিল, যে যুদ্ধে জার্মান নেতৃত্বাধীন বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে ব্রিটিশরা একাই লড়েছিল।

এটা নিশ্চিত যে বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য অনেক ক্ষতিকর কাজ করা হয়েছে। বিশ্বায়ন ও অটোমেশনের ফলে উন্নত দেশগুলোতে চাকরিবাকরি হারাচ্ছে অনেক মানুষ; প্রচুরসংখ্যক দেশে সম্পদের বৃহত্তর অংশ ভোগ করছে শক্তিশালী করপোরেশনগুলো আর ধনাঢ্য ব্যক্তিরা, কিন্তু তারা কর দিচ্ছে কম। যুক্তরাষ্ট্রের রাস্ট বেল্ট, উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে মানুষের জীবনযাত্রার মান অব্যাহতভাবে খারাপ হচ্ছে।

কিন্তু লোকরঞ্জনবাদী নেতারা এসব সমস্যা সমাধানের সুবিবেচিত পথ বাতলাচ্ছেন না, শুধু স্বপ্ন-কল্পনার প্রচার চালাচ্ছেন। ট্রাম্প যে মেক্সিকোর সীমান্ত বরাবর ‘বিশাল ও সুন্দর’ প্রাচীর গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছেন, মুসলমান অভিবাসীদের নিষিদ্ধ করা, কয়লাখনিগুলো নতুন করে খুলে দেওয়া ও চীনের ওপর শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব দিয়েছেন, সেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য নয়। শুধু তা-ই নয়, এসব কারণে বাণিজ্য যুদ্ধ বেধে যেতে পারে, আর সেটা ঘটলে তাঁর ইতিমধ্যে অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত সমর্থকদের অবস্থা আরও খারাপই হবে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলো যখন ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে হয়, তখন লোকরঞ্জনবাদের আবেদন বাড়ে। ফরাসি বিপ্লবের শুরুর পর্যায়ে জ্যাকোবিন, উনিশ শতকের মাঝামাঝি আমেরিকায় ‘নো-নাথিং’ মুসোলিনির ইতালিতে ফ্যাসিস্ট ও হিটলারের জার্মানিতে নাৎসিদের উত্থানের ব্যাপারগুলো এভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। এই গোষ্ঠীগুলোর সবাই দাবি করত যে তারা নৈতিকভাবে বিশুদ্ধ এবং তারা ‘জনগণের’ নামে দূষিত পুরোনো ব্যবস্থা ঝেঁটিয়ে দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

আজকের লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতি দাবি করে যে একমাত্র সেই সত্য; এ রাজনীতি গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও তুরস্কে আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি, এসব দেখে লোকরঞ্জনবাদীরা ক্ষমতা অর্জন করবে, তখন তারা রাষ্ট্রসহ যা কিছু হাতের কাছে পাবে, তা-ই ব্যবহার করবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার লক্ষ্যে।

এ ধরনের লোকরঞ্জনবাদ থেকে ২০১৭ সালে দেশে দেশে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে একটা গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে আমরা এটাও আশা করতে পারি যে এই নতুন আবির্ভূত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর চাপে আপসকামী প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলো অতিপ্রয়োজনীয় সংস্কার কর্মসূচিগুলো গ্রহণে বাধ্য হবে; ডেমোক্রেটিক দলের প্রাইমারি নির্বাচনকালে বার্নি স্যান্ডার্স যেমনটা করার চেষ্টা করেছিলেন। তেমনটা ঘটলে আমাদের বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো সম্ভবত আরও শক্তিশালী হবে এবং যারা সমস্যামুক্তির প্রতিশ্রুতি উচ্চারণ কিন্তু আসলে সৃষ্টি করে নৈরাজ্য, তাদের প্রতিহত করা সম্ভব হবে।

The End

Add a Comment