Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!

ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণা এবং নয়া বর্ণবাদ**

প্রথম আলো,২৪ জুলাই ২০১৮
ড. মারুফ মল্লিক, ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব অরিয়েন্ট অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব বন।


ইসরায়েল ইহুদিদের রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হলো। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল আদতে আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞার বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিল। আধুনিক রাষ্ট্রে সবাইকে নিয়েই থাকতে হয়। সেখানে ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত কোনো বিভেদ থাকবে না। কিন্তু ইসরায়েলে বসবাসরত আরবসহ অন্যান্য জাতি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ইহুদি জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার পাবে না। কিন্তু ইসরায়েল আদৌ আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় পড়ে কি না? যে রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে অবৈধভাবে, প্রতিদিন ভূমিপুত্রদের খুন করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তার কাছে আধুনিক গণতান্ত্রিক আচরণ আশা করা বোকামি ও বাতুলতামাত্র।

নিজেদের ইহুদিদের রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করে ইসরায়েল তার বর্ণবাদী আচরণকে সাংবিধানিক বৈধতা দিল। সামনের দিনগুলোয় ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়বে। মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের ইসরায়েল থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে। হিটলারের বিশুদ্ধ আর্য জাতির গঠনের প্রয়াসের মতোই বিশুদ্ধ ইহুদি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাবে। পরিশেষে ইসরায়েল একবিংশ শতাব্দীর বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হবে।

ইসরায়েল কেন হঠাৎ করে এই ঘোষণা দিল? ইসরায়েল তো একটি ইহুদি রাষ্ট্রই। ইহুদিদের জন্যই পশ্চিমা উদ্যোগ ও আরবদের সহায়তায় এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আইন করে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার কোনোও তাগিদ থাকার কথা না। কেবল ধর্মীয় দিক বিবেচনা না করে বিষয়টি সব দিক থেকেই বিশ্লেষণ করা দরকার। এবং এর সম্ভাব্য পরিণামগুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।

ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনীতির সংযোগ থাকতে পারে। পুঁজিবাদের দোলাচলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমেই এক নতুন মাত্রায় উপনীত হচ্ছে। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র আমেরিকা থেকে অন্যান্য কেন্দ্রে ঘনীভূত হচ্ছে। ন্যাটোকে ঘিরে আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের দূরত্ব বাড়ছে। চীন, ইউরোপ ও রাশিয়াকে ঘিরে নতুন নতুন ক্ষমতার ভরকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। এসব কারণেই সম্ভবত বৈশ্বিক পুঁজিবাদের নেতা হিসেবে আমেরিকার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় ইসরায়েল এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আমেরিকার প্রতি ইসরায়েলের আস্থার সংকটই প্রকাশ পেয়েছে। ইসরায়েল হয়তো একধরনের অনিশ্চয়তার ভুগছে, তাদের জামিনদার হিসেবে আমেরিকা আর রক্ষা করতে পারবে না। ঠিক তাই ইসরায়েল নিজের অজান্তেই স্বীকার করে নিয়েছে তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। আমেরিকা যদি বিশ্বরাজনীতিতে নিজের অবস্থান হারায়, তবে ইসরায়েলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের পাহারা দিয়ে রাখবে কে? এ জন্যই ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক শক্তির প্রয়োগে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়াসে লিপ্ত হয়েছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার পাশাপাশি সামরিক শক্তি প্রয়োগ আকাঙ্ক্ষার ছাপ দেখা যায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্যে। নেতানিয়াহু ট্রাম্পের দোহাই দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েল হোয়াইট হেলমেটকে রক্ষার জন্য সিরিয়ায় অভিযান চালাবে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বরাবরই সিরিয়ায় জঙ্গি আইএসকে মদদদানের অভিযোগ রয়েছে। সিরিয়া, রাশিয়া ও ইরানের সম্মিলিত হামলার মুখে আইএস পশ্চাদপসরণ করছে। সিরিয়ায় মার্কিন ও আইএস জঙ্গিরা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে আছে। পিছু হটছে। তখনই হোয়াইট হেলমেট নামের পাশ্চাত্যের মদদপুষ্ট বিতর্কিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীকে রক্ষার নামে সিরিয়ায় প্রবেশ করতে চাইছে ইসরায়েল। নিজের নাজুক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আশপাশে সামরিক শক্তির প্রয়োগের বড় সুযোগ এখন ইসরায়েলের হাতে। এতে করে আরবে অস্থিরতা আরও বাড়বে। সংঘাত ও সন্ত্রাস বাড়বে। আরবের বুকে যে আগুন জ্বেলে দেওয়া হয়েছে, তা আরও দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে। টিকে থাকতে অস্থির, অস্থিতিশীল আরব ইসরায়েলের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। ইসরায়েল প্রকারান্তরে তাই সন্ত্রাসকে উসকে দিচ্ছে ও দেবে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ইসরায়েল নিজেই নিজের পাতা ফাঁদে পড়ছে। কীভাবে? হিটলারের জাতিগত বিশুদ্ধতার ভূত ঘাড়ে নিয়ে পেছনের দিকে হাঁটছে। ইসরায়েল তার আরোপিত পরিচয় (গিভেন আইডেনটিটি) ইহুদিবাদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। এটা ইসরায়েলে পক্ষে সম্ভবও না। সমান অধিকার নিশ্চিত করেই আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। অতীতের ভূতকে মাথায় নিয়ে কোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। যখন কোনো রাষ্ট্র এই ভূতটাকে সমাধিস্থ করতে পারে, তখন নিজেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ধর্ম, প্রথা, আচার, সংস্কৃতির মধ্যে আটকে থাকে। রাষ্ট্র ধর্মকে ধারণ করতে পারে, কিন্তু ধর্মকে অবলম্বন করতে পারে না। যেমন ইউরোপে অনেক রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকায় ক্রুশ চিহ্ন আছে। কিন্তু ওই রাষ্ট্রগুলো খ্রিষ্টীয় রাষ্ট্র না। বরং বলা যায়, খ্রিষ্টিয়ানিটির ফল হচ্ছে এসব রাষ্ট্র। আরবের অনেক দেশের ইসলামের চিহ্ন চাঁদ-তারকা ব্যবহার করা হয়। ওইগুলো ইসলামিক রাষ্ট্র না। ইরান ইসলামিক রিপাবলিক হলেও কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্র না। ইরানকে একমাত্র মুসলমানদের রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। যখন কোনো রাষ্ট্র রিপাবলিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ওই রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকে না। তবে এ কথা অস্বীকার করা কোনো সুযোগও নেই, সব রাষ্ট্রেই কমবেশি ধর্মীয় উপাদান, নীতি ও রীতির প্রভাব থাকে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে বলা যায়, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে বিপ্লবের প্রেরণা অতীত থেকে নয়, আসতে পারে একমাত্র ভবিষ্যতের স্বপ্ন থেকেই। অতীতের সমস্ত আরোপিত পরিচয় (গিভেন আইডেনটিটি) ভবিষ্যতের উপযোগী করে কিংবা মোচন না করে সেই বিপ্লব শুরু করাও সম্ভব না। আগেকার বিপ্লবগুলোর পক্ষে বিশ্বের অতীত ইতিহাস স্মরণ করার প্রয়োজন ছিল নিজেদের লক্ষ্য বা সারবস্তু সম্পর্কে নিজেদের প্রতারণা করার জন্য। কিন্তু নিজের সারবস্তুতে পৌঁছানোর জন্য অতীতের বিপ্লবকে সমাধিস্থ করে রাখতে হবে। ১৮৪৮ সালে ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারির বিপ্লব ছিল এক অতর্কিত আক্রমণ। পুরোনো সমাজকে আচম্বিতে দখল করে নেয় বিপ্লবীরা। লোকে এই অপ্রত্যাশিত আঘাতটাকে পৃথিবীজোড়া গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি, নতুন যুগপ্রবর্তক ঘটনা বলে ঘোষণা করল। কিন্তু ওই বছরের ডিসেম্বর লুই বোনাপাঁর্তের নেতৃত্বে পাল্টা বিপ্লবে ফেব্রুয়ারির বিপ্লব যেন জাদুবলে মিলিয়ে গেল তাসের জুয়াড়ির মতো। মার্ক্স রাষ্ট্রকাঠামোকে আদতে ধর্মতাত্ত্বিক প্রকল্প হিসেবে দেখতেন। বর্তমানের আধুনিক রাষ্ট্র হচ্ছে এক ঐতিহাসিক কালপর্বে বোঝাপড়ার বাস্তব প্রকাশ। এটা চিরস্থায়ী কোনো গন্তব্য না। এর কোনো পরম ভিত্তি নেই। তাই মার্ক্স রাষ্ট্রকে অতিক্রম বা ছাপিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করে গেছেন। বস্তুত, মার্ক্স এখানে অতীত পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

বৈশ্বিক পুঁজিবাদের পালাবদলর কারণে আরোপিত পরিচয়ের (গিভেন আইডেনটিটি) পর্ব আবারও ফিরে আসছে। ভারতে হিন্দুত্ববাদ, ইউরোপে ইসলামবিদ্বেষ আর আইএসের ইসলামিক খেলাফত। সেক্যুলার সমাজের অনুবাদ আমাদের সমাজে করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। এটা আদতে ভুল। বরং সঠিক অনুবাদ হওয়া উচিত ইহজাগতিকতা। ইহজগতে অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য বর্তমানের সঙ্গে বোঝাপড়াই হচ্ছে সেক্যুলারিজম।

ইসরায়েল এই ইহজগৎকে বা সেক্যুলারিজমকে অস্বীকার করে ধর্ম আশ্রয় করে অস্থিরতা ও সন্ত্রাসকে উসকে দিতে চাইছে। আরও মজার বিষয় হচ্ছে পশ্চিমের মানবতাবাদী সেক্যুলারিজমের প্রবক্তারা নীরবে এসব প্রত্যক্ষ করছেন। টুঁ শব্দটি পর্যন্ত উনারা করছেন না।

Add a Comment